চাষাবাদের ক্ষেত্রে কৃষকরা আবহমানকাল থেকে অর্থকরী ফসল হিসেবে শুধু ধানকেই দেখে আসছেন। ধানের বহুমুখী ব্যবহার ও চাহিদার জন্যই এর প্রভাব কৃষক মহলে বেশি। তবে সম্প্রতি কৃষিতে এসেছে বৈচিত্র . নিত্য নতুন নতুন কৃষি কাজে আগ্রহ সৃস্টি হচ্ছে কৃষকের ,কচু বা কচুরলতি চাষের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন। গত ১০/১২ বছর থেকে কৃষকদের কলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে প্রচুর। প্রাচীন ধ্যান-ধারণা ক্রমেই পাল্টাচ্ছে , আর এই পরিবর্তনের ফলস্বরূপ লাভজনক ফসল হিসেবে তারা কলাকে চিহ্নিত করেছেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, ধান, পাট ও আখসহ প্রচলিত অন্যান্য ফসলের তুলনায় কলাচাষে শ্রম ও ব্যয় হয় কম, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হিসেবে কলার প্রচুর চাহিদা থাকায় বিক্রি করতেও ঝামেলা নেই (বাগান থেকেই বিক্রি করা যায় )। অন্যদিকে পুরো বছর জুড়ে বাজার দর ভালো পাওয়া যায় ,কলার বাজার দরে সচরাচর ধস নামতে দেখা যায়না
কলা চাষ অনেকটা কম ঝামেলাপূর্ণ,একবার কলার চারা রোপণ করলে ২/৩ মৌসুম ফসল পাওয়া যায়। বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত না হলে ১ একর জমি থেকে ধান পাওয়া সম্ভব (ইরি-আমন মিলিয়ে) ৮০/৯০ মণ। এর আনুমানিক মূল্য ৪৫/৫০ হাজার টাকা। এতে বর্তমান সময়ে খরচ হবে (চাষ,বীজ , সার,কীটনাশক, লেবার, আগাছাপরিষ্কার,সেচ সহ) প্রায় ২০ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে এক একর জমির কলা বিক্রি হবে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর কলা চাষে সকল কিছূ মিলিয়ে সর্বোচ্চ খরচ হবে ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া অনেক অঞ্চলে কলার মোছা বিক্রয় করে অতিরিক্ত আয় করা যায়, কারণ এটি উত্কৃষ্টমানের তরকারি হিসেবে ব্যবহ্নত হয়।
চাহিদার জন্য কোনো কোনো গ্রামে কলাকে প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কলার কল্যাণে এলাকার কৃষকদের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরছে তাদের সংসারে। বাজারে কলার চাহিদা ও দাম সন্তোষজনক হওয়ায় কৃষকরা কলার দিকে ঝুঁকছেন।
যেভাবে চাষ শুরু করতে হবে----
জাত বাছাই : আমাদের দেশে এলাকাভেদে বিভিন্ন জাতের কলা চাষ হয়ে থাকে , যেমন -- অমৃত সাগর, মেহের সাগর, সবরি, অনুপম, চাম্পা, কবরী, নেপালি, মোহনভোগ, মানিক ইত্যাদি। তবে সবরি, মানিক, মেহের সাগর ও নেপালি কলার চাহিদা অত্যন্ত বেশি, চাষও হয় ভালো এবং খেতেও অনন্য।
জমি তৈরি ও সার প্রয়োগ :
৩-৪ বার চাষ দিয়ে জমি ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হবে। এরপর জৈবসার (যেমন পচা গোবর,কম্পোস্ট সার , পচাঁনো কচুরিপানা ইত্যাদি) হেক্টরপ্রতি ১২-১৪ টন হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। তারপর ২–২ মিটার দূরত্বে গর্ত খনন করতে হবে। প্রতিটি গর্তে ৬ কেজি গোবর, ৫০০ গ্রাম খৈল, ১২৫ গ্রাম ইউরিয়া, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমপি, ১০০ গ্রাম জিপসাম, ১০ গ্রাম জিংক এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। ১৫ দিন পর প্রতিটি গর্তে নির্ধারিত জাতের সতেজ,রোগমুক্ত ও সোর্ড শাকার (তরবারি চারা) চারা রোপণ করতে হবে। এভাবে একরপ্রতি সাধারণত ১ হাজার থেকে ১১শত চারা রোপণ করা যায়। পরবর্তী সময়ে ২ কিস্তিতে বৃষ্টির আগে অর্থাত জৈষ্ঠ মাসের শেষে একবার এবং বৃষ্টির পরে অর্থাত ভাদ্র -আশ্বিন মাসে একবার মোট ২ বার গাছপ্রতি ১২৫ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমপি ৩ মাস অন্তর অন্তর প্রয়োগ করতে হবে।
রোপণের সময় :
কলার চারা বছরে তিন মৌসুমে রোপণ করা যায়। প্রথম মৌসুম মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ। দ্বিতীয় মৌসুম মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে। তৃতীয় মৌসুম মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা :
শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পর পর সেচের প্রয়োজন হয়। গাছ রোপণের প্রথম অবস্থায় ৫ মাস পর্যন্ত বাগান আগাছামুক্ত রাখা জরুরি। কলাবাগানে জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
সাথী ফসল :
চারা রোপণের প্রথম ৪/৫ মাস বলতে গেলে জমি ফাঁকাই থাকে। যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চারা রোপণ করা হয়, তবে কলাবাগানের মধ্যে আন্তঃফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া, শসা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি উত্পাদন করা যায়।
কলার রোগ ও প্রতিরোধ :
সাধারণত কলাতে বিটল পোকা, পানামা রোগ, বানচিটপ ভাইরাস ও সিগাটোকা রোগ আক্রমণ করে থাকে।
কলার ছড়িতে বস্তা জড়িয়ে রাখলে বিটল পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়. এই রোগে আক্রান্ত হলে কলা সাধারণত কালো কালো দাগযুক্ত হয়। প্রতিরোধের জন্য ম্যালথিয়ন অথবা লিবাসিস ৫০ ইসিসহ সেভিন ৮৫ ডব্লিউপি জাতীয় ঔষধ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
পানামা রোগে সাধারণত কলাগাছের পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছ লম্বালম্বি ফেটে যায়। এ রোগের প্রতিরোধে গাছ উপড়ে ফেলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই।
বাঞ্চিটর ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কলার পাতা আকারে ছোট ও অপ্রশস্ত হয়। এটি দমনের জন্য রগর বা সুমিথিয়ন পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। সিগাটোগায় আক্রান্ত হলে পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়। এক সময় এ দাগগুলো বড় ও বাদামি রং ধারণ করে। এ অবস্থা দেখা দিলে আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়ে ফেলতে হবে এবং মিলিটিলট-২৫০ ইসি অথবা ব্যাভিস্টিন প্রয়োগ করা যেতে পারে।
0 commenti:
Posta un commento